Saturday, July 6, 2019

গল্প

লক্ষী

তখন থেকে লক্ষীকে বলছি ওরে একটু বই নিয়ে বস। না এক্কেবারে কথা শোনে না। এ কবছর সমানে চেষ্টা করে চলেছি এখনো বর্ণ পরিচয়ের প্রথম ভাগটাও ভালো করে পার করাতে পারলাম না । একটা ছোটখাটো স্কুলে ভর্তি করালাম সেখানেও গেলো না। সকাল থেকে বিতানের সব আব্দার মিটিয়ে চলেছে। এখন আবার দুজনের মধ্যে দুর্গা পুজোর পরিকল্পনা চলছে।
"আশ্চর্য ! এইতো সবে পুজো শেষ হলো লক্ষী, সামনের পুজো আসতে এখনো নয় মাস দেরী আছে, বইটা নিয়ে আয় তো আমার কাছে", আমি হাঁক পড়লাম।
সে মেয়ে নাচতে নাচতে এসে হাজির, হাতে কোনো বই নেই, "মামী রাতের তরকারিটা তোমায় কেটে দেবো?"
আমি প্রচন্ড রেগে বললাম, "রাত তো এখনো ঢের দেরী, এখন তো সবে দুপুর এগারোটা।"
"তবে তোমার জন্য চা করে নিয়ে আসি", বলে রান্নাঘরে চলে গেলো।
জানে এই বস্তুটির ওপর আমার দুর্বলতা আছে। ছুটির দিনে এইসময় একটু চা পেলে ভালই লাগে। রাগটা ভালোবাসা হয়ে গেলো নিমেষে।
লক্ষী আমার সংসার আর মন দুটোই জুড়ে আছে। তেরো বছর বয়সের বাপ মা মরা মেয়ে লক্ষীকে ওর কাকা আমার বাড়িতে দিয়ে যায় কাজের জন্য। ঐটুকু মেয়েকে দিয়ে কাজ করাবো কি? সেই থেকে লক্ষী আমার বিতানের সঙ্গী। তখন বিতান সবে হয়েছে। আমার স্কুলের 'মেটারনিটি' ছুটিও প্রায় শেষ। এদিকে শাশুড়ি মায়ের শরীর ভালো না। আমি তো হাতে স্বর্গ পেলাম। আমার ভোরের স্কুল। সকালের ঐ কয়েক ঘন্টা তো বিতানের কাছে থাকতে পারবে। নটা পর্যন্ত তো ছেলেটা ঘুমিয়েই থাকে। আমি সাড়ে দশটায় বাড়ি। কাছেই স্কুল।
বিতানকে লক্ষী এতো যত্ন করত যে মাঝে মাঝে আমারই তাক লেগে যেতো। আর বিতান তো লক্ষীদিদি অন্ত প্রাণ। আমার শাশুড়ি মায়েরও নয়নের মণি লক্ষী। সন্ধ্যে থেকেই যতো রাজ্যের সিরিয়াল দেখবে আর সারাদিন তার চর্চা করবে দুজনে। এদিকে আমি পড়ার কথা বললেই যত গোল। অ আ ক খ কোন রকমে মুখস্থ করালাম। লেখার সময় অশান্তি। অ আ লেখা শেখা হলো। ই ঈ শেখাতে গিয়ে সে লেখা শিখল কিন্তু অ আ লেখা ভুলে গেলো। দুটো অক্ষর লেখা শিখলে আগের অক্ষর দুটো আর লিখতে পারে না, ভুলে যায়। এই ভাবে হয়? কাছেই একটা স্কুলে ভর্তি করলাম, যা শুরু করলো যেন দড়ি টানাটানি খেলছি । দুত্তোর। বাড়িতে যা শেখার শেখ বাপু।তবে লেখাপড়ায় রসগোল্লা হলে কি হবে মোবাইলে কিন্তু দিগগজ। সময় পেলেই মোবাইল নিয়ে খুটখাট। গেম খেলছে, বিতানের ছড়া রেকর্ডিং করছে, নিজে কত রকম গলা নকল করে রেকর্ডিং করছে। আমি মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে বলি, "এই মোবাইলই তোর কাল" এগুলো কি করে শিখে নেয় কে জানে!
এমন ভাবেই চলছিল বেশ। পাঁচ বছর কেটে গেল। ওদিক শুনতে পাচ্ছিলাম লক্ষীর কাকা, কাকি ওর বিয়ের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। গত মাসে টাকা নিতে এসে আমাকে শুনিয়ে গেলো সে কথা। লক্ষী তো রেগেই আগুন। তাদের দুকথা শোনাতে ছাড়ল না। আমি ওনাদের বললাম, "আরেকটু বড় হ'তে দাও, এতো তাড়াহুড়োর কি আছে?" জানি বলে কোনো লাভ নেই।
কাল স্কুল থেকে ফিরে দেখি ধুন্দুমার কান্ড। লক্ষীর কাকা এসেছেন ওকে নিতে, পরশু নাকি লক্ষীর বিয়ে। ওমা!!! লক্ষীর দিকে তাকিয়ে আমার ভিরমি খাবার অবস্থা, ও ন্যাড়া!!! দেখে আমি হতবাক। কাকা অগ্নিশর্মা, "কি করে বিয়ে হবে? সব আপনাদের চালাকি"। ওদিকে লক্ষী সমানে ব'লে চলেছে ওর মাথায় নাকি উকুন হয়েছিল তাই ন্যাড়া হয়ে এসেছে।
উকুন???? জানি না তো ?? কি কান্ড, কি যে করি! প্রচুর অশান্তি করে খালি হাতে লক্ষীর কাকা বিদায় নিলেন তবে বলে গেলেন ওনাদের লক্ষীর প্রতি আর কোনো দায়িত্ব রইল না। এবার লক্ষী ঝেড়ে কাশলো। ও নাকি বিয়ের কথা জানতে পেরেছিল। উকুন টুকুন সব বানানো , বিয়ে আটকানোর দাওয়াই।
"তাই বলে এই বয়সে তুই ন্যাড়া হলি! উফ্ আমি তোকে নিয়ে আর পারি না!" আমি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম।
সর্ব বিষয়ে লক্ষীর ওস্তাদির কিন্তু শেষ নেই। চাল ডাল এর হিসেব থেকে নিউক্লিয়ার ফিজিক্স সব ও জানে। বাড়িতে কোনো বিষয় আমরা আলোচনা করলে কিছু বক্তব্য ওর থাকবেই ।
এই তো সেদিন আমার মামা শ্বশুর আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। উনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, "বৌমা তোমরা সল্টলেকে যে ফ্ল্যাটটা কিনলে, কত তলায়?" আমি উত্তর দিতে যাবো সবে হা করেছি মাঝখান থেকে লক্ষী বলে উঠল, "আন্ডারগ্রাউন্ডে।" আমি তো হা ছিলামই, মামা আরও বড়ো হা করে রইলেন , "বাবা বেশ আধুনিক ফ্ল্যাটবাড়ি তো!!! আন্ডার.............. " আমি তাঁকে আশ্বস্ত করে বললাম, "মামা ওটা গ্রাউন্ডফ্লোরে কিনেছি"। হায় ভগবান! কি শোনে আর কি বলে! অথচ সিনেমা সিরিয়াল সব তার মনে থাকে। গান নাচ অভিনয় সব কিছুই দিব্বি অনুকরণ করতে পারে।
নাচটা অবশ্য সত্যিই অপূর্ব করে। কোথা থেকে এটা শিখল জানিনা। অনবদ্য তাল জ্ঞান। এ নিশ্চয়ই ওর জন্মগত। কোনো গান বা তাল শুনলে ওর যেন কি হয়। আপনা থেকেই শরীরে দোলা শুরু হয়। নিজেকে সংযত করে বটে তবে আমি যদি একবার নাচতে বলি তো মহানন্দে শুরু করে দেয়। কি যে এক স্বর্গীয় সুখ ওর চোখে মুখে ফুটে ওঠে!!! প্রতিবছর পাড়ার দুর্গা পুজোয় ধুনুচি নাচে লক্ষীর প্রথম পুরস্কার বাধা।
দেখতে দেখতে পুজো এসে গেলো। এবার আমাদের পাড়ার পুজোর পঞ্চাশ বছর। চতুর্থী থেকেই পুজো শুরু হয়ে গেছে। খুব আড়ম্বর করে পুজো হচ্ছে। বিশাল এক ঢাকির দল এসেছে। অপূর্ব ঢাক বাজায়। ছন্দে ছন্দে পুজো একেবারে জমজমাট।
অষ্টমীর দিন ধুনুচি নাচের প্রতিযোগিতা। বিকেল থেকেই সাজো সাজো রব। এবার যেন আরো বেশী প্রতিযোগী, আরো বেশী আড়ম্বর। লক্ষীও বেশ উত্তেজিত। সুন্দর করে সেজে সেও তৈরী। তবে লক্ষীকে যেন একটু অন্যরকম লাগছে। ও প্যাণ্ডেলেই বেশী সময় কাটাচ্ছে। পাশের বাড়ির পিনু মাসী আজ দুপুরে প্যাণ্ডেলে খাওয়ার সময় বলছিলেন ঢাকিদলের মধ্যে একটা ছেলের সঙ্গে নাকি লক্ষী একটু বেশী মেলামেশা করছে। আমিও কাল খেয়াল করেছিলাম ব্যাপারটা। এটা তো বাড়তে দেওয়া যাবে না। প্যাণ্ডেলে যাওয়ার আগেই লক্ষীকে তাই ডাকলাম, "লক্ষী ঐ ঢাকি ছেলেটির নাম কি?" কোনো ভনিতা না করেই ও বললো "রাজু।
"তোর ওকে পছন্দ?" লক্ষী মাথা নেড়ে বললো "ও আমাকে বিয়ে করতে চায়।"
"আর তুই?"
ও মাথা নোয়ালো।
"তাই নাকি? ওর কোনো খবর জানিস তুই ? দু দিনের আলাপে ...... শুধু ঢাক বাজিয়ে দিন চলে? এছাড়া কি করে ও?"
"ও ভালো চোখে দেখে না মামী। কি করবে? হ্যাঁ একটা যাত্রা দলে মাঝে মাঝে বাজনা বাজায়।"
আমি বসে পড়লাম। "মানেটা কি???? একটা অন্ধ ছেলে! তেমন কোনো রোজগার নেই! তুই ওকে বিয়ে করবি? । কক্ষনো না। আমি হতে দেবো না। ওরে তুই আমার কাছে যে ভাবে থাকিস ওর কাছে সে ভাবে থাকতে পারবি না!! আমি তোকে ভালো ঘরে বিয়ে দেব।"
লক্ষী তখন অঝোরে কাঁদছে, "বড় মায়ায় পড়ে গেছি মামী। ওর আপনার কেউ নেই, এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়। চোখের অসুবিধে। আমি ওর সঙ্গেই থাকব।"
আমি কড়া ভাবে বললাম, "তোমার কোথাও যাওয়া চলবে না, বাড়ি থেকে এক পাও বেরোবে না তুমি।"
আমাদের পুজো অন্ধকার হয়ে গেলো। লক্ষী অতিরিক্ত চুপচাপ। বুঝতে পারছি কেঁদে কেঁদে চোখমুখ লাল। কিন্তু এ আমি কিছুতেই হোতে দেবো না, লক্ষীর জীবন আমি কিছুতেই নষ্ট হোতে দেবো না, কিছুতেই না।
একাদশীর দিন বিসর্জন। আমি বিকেলে মাকে বরণ করতে যাব। বিতানকে রেখে গেলাম।। শাশুড়ি মায়ের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলাম লক্ষী ওনার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে আর উনি লক্ষীর মাথায় হাত বোলাচ্ছেন। আমি কোনো কথা না বলে প্যাণ্ডেলে চলে গেলাম। মাকে বরণের পর এদিক ওদিক দেখলাম কিন্তু রাজুকে দেখতে পেলাম না। সবার সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করে ঘরে ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে গেলো। এসেই সন্ধ্যে দিলাম। শাশুড়ি মাকে প্রণাম করতে ওনার ঘরে ঢুকে দেখি উনি ঝিমোচ্ছেন। প্রণাম করে লক্ষী আর বিতানের খোঁজ করলাম। বিতান দেখলাম ছবি আঁকছে। কিন্তু লক্ষী কই? কোথাও তো দেখতে পাচ্ছি না? ওর মোবাইলটাও ডাইনিং টেবিলের ওপর পড়ে আছে। ছুটে আশে পাশে দেখলাম , প্যাণ্ডেলে দেখলাম---- নেই!!!!! কোথাও নেই!!!!! আচ্ছা ঢাকিদের মধ্যে রাজুকে তো দেখিনি তখন? তাই তো!!! ছুটে গেলাম আবার। সব অন্ধকার, মায়ের মন্ডপে শুধু প্রদীপ জ্বলছে। ঢাকি ভাইয়েরা বিসর্জন দিয়ে ফেরে নি। পাড়ার সকলেই মোটামুটি বিসর্জনে গেছেন। জানি ওদের ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে। ফিরে এলাম। পরিস্কার হয়ে গেলো সব। নিদ্রাহীন রাতে মনের মধ্যে আশার প্রদীপ নিয়ে বসে রইলাম। পুলিশে যাবো? যদি ফিরে আসে! ভোর না হোতেই পায়ে পায়ে প্যাণ্ডেলে গিয়ে ঢাকিদের সক্কলকে রাজুর ব্যপারে জিজ্ঞাসা করলাম। কেউ তেমন কিছু বলতে পারল না, তবে এটুকু বুঝলাম পাওনা টাকা না নিয়ে রাজু কাউকে কিচ্ছু না বলে চলে গেছে। বিসর্জনে সে যায় নি।
আমার ঘর যে অন্ধকার হয়ে গেলো। বাড়িতে এসে অসহায়ের মতো কাঁদলাম। কি করবো আমি? কোথায় খুঁজব তাদের? রাগে দুঃখে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। "এতো বেইমান তুই!! মাত্র কয়েকদিনের একটা সম্পর্কের জন্য তুই আমায় ছেড়ে এক কাপড়ে ওর সঙ্গে চলে গেলি!!!" পুলিশের কাছে রিপোর্ট লিখিয়ে এলাম, জানি না কি ভাবে আরো একটা দিন কেটে গেলো। ফিরল না লক্ষী। সন্ধ্যেবেলায় বসে বসে লক্ষীর মোবাইলটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলাম। লক্ষীর গলার আওয়াজটা শুনতে ইচ্ছে করলো। রেকর্ডিং লিস্টে গিয়ে শেষ রেকর্ডিংটা বাজালাম। কি শুনছি আমি? কি বলছে লক্ষী? "দিদি রাজুকে আমি ফিরিয়ে দিয়েছি জানো। তোমার কথার অবাধ্য হই কি করে বলো? কিন্তু আমি যে রাজুকে কোনোদিন ভুলতে পারবো না। একদিকে তুমি, একদিকে রাজু--- আমি কাকে বেছে নেবো বলতো? ছোটবেলায় বাবা মাকে হারিয়েছি। রাজু আর তোমাকেও হারাতে পারবো না, তাই নিজেকেই শেষ করে দিলাম। এর জন্য কারোর কোনো দায় নেই দিদি, সব আমার ভাগ্য।"
...............এরপর আমার আর কিছু মনে নেই।
আমি বুঝিনি মা দুর্গার বিসর্জনের সময় আমার লক্ষীর ও বিসর্জন হয়ে গেছে। তিনদিন পর গঙ্গায় লক্ষীর শরীরটা ভেসে উঠেছিল।
□□□□□□□□□সমাপ্ত□□□□□□□□

শর্বরী চক্রবর্তী
18/12/2018

কবিতা

সেই ছেলেটা

সেই ছেলেটা ছিল তো বেশ!
যেমন ধরো ছোট্টবেলায়,
একমনে কী খুঁজতো যেন,
চড়ক কিংবা রথের মেলায়।
ভিড়ের মাঝে মানুষগুলো
দেখতে তো তার লাগতো ভালো।
কেউ ছিল তার মনের মতন,
কেউ বা ছিল ভীষণ কালো।
খেলাধুলা, লেখাপড়া লাগতো ভালই।
করতো সে তার মর্জি মাফিক।
জবাবদিহি করবে কাকে?
নিজেই তো সে নিজের মালিক।
সেই ছেলেটার একলা জীবন।
দিন কেটে যায় এমন ভাবে।
আত্মা ছাড়া আত্মীয়তায়
এমন ভাবেই বাঁচতে হবে।
সময় কেবল বয়েই চলে।
প্রবহমান কালের ধারায়।
সেই ছেলেটা ভাবছে কিছু,
লিখছে কিছু মনের খাতায়।
প্রাণের মাঝে যে সাধগুলো
গুমরে ছিল বোঝে নি সে,
ইচ্ছেডানায় ভর করে তা
মেলছে পাখা নীল আকাশে।
সেই ছেলেটা আজকে জানে
অবহেলার জবাব দিতে।
মুঠোয় ভরা সূর্য নিয়ে
হাঁটছে সে আজ সফল পথে।

শর্বরী চক্রবর্তী
28/06/2019